
স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে দেশে ফিরে কোন নেতা যদি বলেই বসেন, “আমার কাছে পরিকল্পনা আছে,” এবং সেই বক্তব্য ঘিরে যদি অঘোষিতভাবে অজেয় নিরাপত্তা বলয় ও প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের আবহ তৈরি হয়—তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির লক্ষণ নয়। বরং এটি এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধের প্রকাশ, যেখানে দল, মত ও প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তি নিজেকেই রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে হাজির করেন। এই মানসিকতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক—গণতন্ত্রকেন্দ্রিক নয়।
গণতন্ত্রে পরিকল্পনা কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি হতে পারে না। পরিকল্পনা জন্ম নেয় আলোচনা থেকে, বিতর্ক থেকে, ভিন্নমতের সংঘর্ষ থেকে। “আমার পরিকল্পনা” বলার মধ্যে একটি মৌলিক সমস্যা আছে—এতে দলীয় কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং কর্মীদের সম্মিলিত ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়ে। নেতা তখন পরামর্শদাতা নন, হয়ে ওঠেন নির্দেশদাতা; সহযাত্রী নন, হয়ে ওঠেন অবিকল্প কেন্দ্র।
তারেক জিয়ার বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকে রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করার পর দেশে ফিরে এসে যদি তিনি নিজের ব্যক্তিগত পরিকল্পনাকেই সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই পরিকল্পনা কতটা দলীয় আলোচনার ফসল, আর কতটা ব্যক্তি-ভাবনার প্রতিফলন? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত করার জায়গা আদৌ আছে কি না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি-নির্ভরতা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এর পরিণতি সব সময়ই ভয়াবহ হয়েছে। যখন দল দুর্বল হয় আর ব্যক্তি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে আনুগত্যের খেলায় পরিণত হয়। নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা নেতা, প্রশ্নহীন বক্তব্য, আর “আমি জানি কী করতে হবে”—এই বয়ান শেষ পর্যন্ত কর্মীদের নিষ্ক্রিয় করে এবং দলকে পরিণত করে একটি অনুসারী গোষ্ঠীতে।
গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব মানে নিখুঁত পরিকল্পনা ঘোষণা করা নয়; বরং অসম্পূর্ণতা স্বীকার করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পথ খোঁজা। যে নেতা শুরুতেই নিজেকে সমাধানের একমাত্র উৎস হিসেবে তুলে ধরেন, তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেই জানান দেন—এটি অংশগ্রহণের রাজনীতি নয়, এটি নির্দেশের রাজনীতি। আর সেই রাজনীতিতে গণতন্ত্র থাকে নামমাত্র, বাস্তবে নয়।
মোঃ ফকরুল ইসলাম
প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক
জয় বাংলা ব্রিগেড কেন্দ্রীয়
Joy Bangla Brigade
Michigan USA #27-12-2025

